বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৬ শতাংশের ঘরে

নতুন বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ড শ্লথ হয়ে যাবে

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার মৌলিক এক কৌশল হলো নীতি সুদহার বৃদ্ধি। দেশে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের স্তর ‍দিন দিন স্ফীত হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও তা ‍নিয়ন্ত্রণে সে পথেই যাত্রা শুরু করে।

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার মৌলিক এক কৌশল হলো নীতি সুদহার বৃদ্ধি। দেশে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের স্তর ‍দিন দিন স্ফীত হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও তা ‍নিয়ন্ত্রণে সে পথেই যাত্রা শুরু করে। বাজারে অর্থ সরবরাহের লাগাম টেনে ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় দফায় দফায় বাড়িয়েছে নীতি সুদহার, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে।

দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে দুটি ঘটনা দেশের অর্থনীতিতে পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রথমত, নীতি সুদহার বাড়ানোর বিশেষ কোনো প্রভাব পড়েনি মূল্যস্ফীতিতে। গত মাসেও মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ শতাংশের ওপরে। দ্বিতীয়ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উদ্বেগজনক হারে কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি শেষে (ফেব্রুয়ারি ’২৪-ফেব্রুয়ারি ’২৫) বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। আগের মাস জানুয়ারিতেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার গত ২১ বছরে সর্বনিম্ন। সর্বশেষ ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮২ শতাংশের নিচে নেমেছিল।

স্বাভাবিকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ না বাড়ার অর্থ হলো দেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়া। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয় ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটে, যা পক্ষান্তরে বেশির ভাগ সময় বাজারদর আরো উসকে দেয়। সেই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়। বলাবাহুল্য এসবই ঘটনা ও আগে থেকে বিদ্যমান নানামুখী অর্থনৈতিক সংকট, ভঙ্গুর বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে মূল্যস্তর দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠেছে।

অর্থাৎ একদিকে মূল্যস্ফীতি কমেনি, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের শ্লথগতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিতে নীতি সুদহার বাড়ানোর মতো পদক্ষেপে হিতে বিপরীত হয়েছে। বেসরকারি খাতকে চাপে রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানো কঠিন হবে।

দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস বেসরকারি খাত, প্রায় ৯০ শতাংশ। শিল্পের উৎপাদন, বিপণন কিংবা সেবা খাতের সিংহভাগই বেসরকারি খাতনির্ভর। আর এ খাতের প্রসারে ব্যাংক ঋণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগও। যখন সরকার ব্যাংক সুদহার এবং নীতি সুদহার বাড়ায় তখন এ খাতে ঋণের চাহিদা কমে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যাংক ও নীতি সুদহার কয়েক দফা বৃদ্ধি করলে খাতটিতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমেনি। টানা দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, কমবেশি ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় বাড়তি দাম গুনতে গিয়ে আর্থিক চাপে রয়েছে জনসাধারণ। কেননা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়েনি মজুরি বৃদ্ধির হার। বিবিএসের হিসাবে, গত মার্চে জাতীয় মজুরি হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরিনির্ভর বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি পড়ছে।

মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। খেলাপি ঋণ বেড়ে ব্যবসায়ীরা আরো নাজুক পরিস্থিতিতে পড়বেন। তাছাড়া ব্যাংক সুদহার ও নীতি সুদহার বাড়ানোয় নতুন বিনিয়োগের মাত্রাও কমেছে। আবার নতুন বিনিয়োগ না হলে তাতেও ঋণের চাহিদা কমে ঋণ প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এসব মিলিয়ে এক প্রকার দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকে ধুঁকে চলছে বেসরকারি খাত। ফলে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিতেও স্থবিরতা চলছে। এতে বেকারত্বের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ বাস্তবতায় কীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো যায় এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে সরকারের কাজ করা আবশ্যক। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো না গেলে বেকারত্ব বেড়ে অর্থনীতির ক্ষত আরো গভীর হবে। আর বেসরকারি খাতের গতি বাড়লে তা সামষ্টিক অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়াচ্ছে, এ যুক্তি একেবারে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে নীতি সুদহার বাড়ানোয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা প্রভাব পড়ে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদাও কমে যায়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে সংকোচন দেখা দেয়। বিনিয়োগ কম হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান কমে যায়, যা দেশের অর্থনীতিতে চক্রাকারে ঘটছে। এখন জরুরি হলো এ চক্র থেকে বের হওয়ার পথে হাঁটা। সেজন্য বেসরকারি খাতকে কীভাবে চাপমুক্ত রাখা যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে।

কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। উপরন্তু গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নানা ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা-অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতিতে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ আরো সংকুচিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, বেসরকারি খাতের জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না নিলে সে পথ আরো সংকুচিত হবে।

বিগত সরকারের আমলে এক প্রকার কোণঠাসা হয়ে ছিল বেসরকারি খাত। এ সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণনির্ভরতার কারণে ঋণবঞ্চিত হয়ে আসছে খাতটি। আবার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বহুদিন ধরেই বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদনের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। এছাড়া রাজনৈতিক মদদে কতিপয় অলিগার্ক ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে, যাদের হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। তারাই মূলত দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছে ও বিপুল পরিমাণ অর্থও পাচার করেছে। এছাড়া ভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে অযথা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলেও নতুনভাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগে থেকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট তো রয়েছেই। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের পথে হাঁটার বিকল্প নেই। এজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এমন নীতি-কৌশল নিতে হবে— যা বেসরকারি উদ্যোগে স্বস্তি ফেরাবে।

আরও